বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব

সিঙ্গাপুরের পুঁজিবাজারের দিকে নজর চীনা কোম্পানিগুলোর

চীনের মূল ভূখণ্ড বা হংকংয়ের কমপক্ষে পাঁচটি কোম্পানি এক-দেড় বছরের মধ্যে সিঙ্গাপুরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), দ্বৈত তালিকাভুক্তি বা শেয়ার প্লেসমেন্টের পরিকল্পনা করছে।

চীনের মূল ভূখণ্ড বা হংকংয়ের কমপক্ষে পাঁচটি কোম্পানি এক-দেড় বছরের মধ্যে সিঙ্গাপুরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), দ্বৈত তালিকাভুক্তি বা শেয়ার প্লেসমেন্টের পরিকল্পনা করছে। সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র এসব তথ্য উল্লেখ করে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে চীনা কোম্পানিগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের উপস্থিতি বাড়াতে চাচ্ছে।

সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরের পুঁজিবাজারের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে একটি জ্বালানি কোম্পানি, একটি চীনা স্বাস্থ্যসেবা গ্রুপ এবং সাংহাইভিত্তিক একটি বায়োটেক কোম্পানি। তবে বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত না হওয়া কোম্পানিগুলোর নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সূত্রগুলো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনা কোম্পানির এ সম্ভাব্য তালিকাভুক্তি সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জ লিমিটেডকে (এসজিএক্স) চাঙ্গা করতে সাহায্য করবে। এসজিএক্স সাধারণত রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্টের (আরইআইটি) মতো স্থিতিশীল আয়ভিত্তিক বিনিয়োগের জন্য জনপ্রিয়। তবে লেনদেনের পরিমাণ বাড়াতে এখানে বেশিসংখ্যক বড় কোম্পানির তালিকাভুক্তির চাহিদা রয়েছে।

এসজিএক্সের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মাত্র চারটি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে এ শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেছে। এর তুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বী হংকং এক্সচেঞ্জেস অ্যান্ড ক্লিয়ারিং লিমিটেড একই সময়ে ৭১টি নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্ত করেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিজিএস ইন্টারন্যাশনাল সিকিউটিরিজের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান জেসন সও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে চাইছে চীনা কোম্পানিগুলো। কারণ তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশ বা সম্প্রসারণ করতে আগ্রহী।’

কয়েক দফা বাড়ানোর পর ২ এপ্রিল পর্যন্ত চীনা পণ্যে মার্কিন শুল্ক দাঁড়ায় ১৪৫ শতাংশ। এর জবাবে চীনও মার্কিন পণ্যে ১২৫ শতাংশ শুল্ক বাড়ায়। এরপর চলতি মাসের মাঝামাঝিতে উভয় দেশ ৯০ দিনের জন্য শুল্কবিরতির সিদ্ধান্ত নেয়। এতে শুল্ক কমে আসে ১০০ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই অনিশ্চয়তা জিইয়ে রাখে। সে বিবেচনায় অনেকে বলছেন, পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। যার কারণে চীন বিকল্প পন্থা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।

এর আগে ট্রাম্প যখন চীনের ওপর বাণিজ্যিক পদক্ষেপ বাড়াতে থাকেন, তখন এসজিএক্সে তালিকাভুক্তি নিয়ে খোঁজখবর নেয়ার প্রবণতা ছিল আকাশছোঁয়া। এ তথ্যও জানিয়ে রাখছেন জেসন সও। অন্যদিকে এসজিএক্সের গ্লোবাল সেলস ও অরিজিনেশন বিভাগের প্রধান পল ডে উইন বলেন, ‘আগামী কয়েক বছর বা দশকে চীনের সঙ্গে বিশ্বের সংযোগ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।’

অবশ্য এ কর্মকর্তা সিঙ্গাপুরের পুঁজিবাজারে চীন ও হংকংয়ের কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। শুধু এটুকুই বলেন, ‘চীনের বাইরের জগতে প্রবেশের জন্য বাণিজ্য বা ব্যবসা যা-ই হোক সিঙ্গাপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে। আর সিঙ্গাপুরে তালিকাভুক্তি সেই পথের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্রোকারেজ চায়না গ্যালাক্সি সিকিউরিটিজের একটি ইউনিট সিজিএস ইন্টারন্যাশনাল। এ বছরই সিজিএক্সে তালিকাভুক্তি হতে পারে তারা অন্তত এমন দুটি চীনা কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছে। তবে কোম্পানিগুলোর নাম প্রকাশ করেননি জেসন সও।

সাধারণত আসিয়ানভুক্ত অঞ্চল বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার বিবেচনা করা হয় সিঙ্গাপুরকে। একটি সূত্র জানিয়েছে, চীনের মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের কয়েকটি কোম্পানি সিঙ্গাপুরে প্রাথমিক তালিকাভুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১০ কোটি ডলার সংগ্রহ করতে পারে।

সাধারণত অফশোর তালিকাভুক্তির জন্য চীনা কোম্পানিগুলোর পছন্দের শীর্ষে থাকে না এসজিএক্স। বেশির ভাগ কোম্পানিই হংকংকেই বেছে নেয়। কারণ বেইজিং এ শেয়ারবাজারকে সহযোগিতা দিয়ে থাকে এবং এখানকার প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা বিনিয়োগকারীরা চীনা ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে বেশি পরিচিত।

তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে বেইজিং। ফলে কিছু চীনা কোম্পানি এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়াতে অনুপ্রাণিত হয়েছে বলে জানান পুঁজিবাজারের পরামর্শদাতারা।

এ তালিকাভুক্তি পরিকল্পনার পেছনে আরেকটি কারণ হলো সিঙ্গাপুর সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ। ফেব্রুয়ারিতে নগররাষ্ট্রটির সরকার শেয়ারবাজার শক্তিশালী করতে কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করে, যার মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক তালিকাভুক্তির ওপর ২০ শতাংশ কর রেয়াত। সঙ্গে বলা হচ্ছে, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) আরো কিছু উদ্যোগ নেয়া হবে।

এ পদক্ষেপগুলো স্থানীয় আইপিও বাজারে আগ্রহ বাড়াবে বলে মনে করেন বিগ ফোর অ্যাকাউন্টিং প্রতিষ্ঠান ইওয়াইয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আইপিও বিভাগের প্রধান রিঙ্গো চোই। তার মতে, সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভূরাজনৈতিক নিরপেক্ষ অবস্থান কোম্পানিগুলোর কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।

তবে সিঙ্গাপুরের স্টক এক্সচেঞ্জে চীনা কোম্পানির সম্প্রসারণ অনেক বড় হবে, এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন অনেকেই। তারা বলেন, সিঙ্গাপুর শিগগির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে হংকংয়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। কারণ এসজিএক্সের বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল। তারা স্থিতিশীল ও কম ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারের দিকে ঝুঁকে থাকেন। এছাড়া সিঙ্গাপুরে কোম্পানিগুলোকে কঠোর নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

অনেকেই মনে করছেন চীনা কোম্পানির বাজার সম্প্রসারণের এ প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রক নীতির শিথিলীকরণ প্রয়োজন। নাম প্রকাশ না করে সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি বহুজাতিক সফটওয়্যার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘বিশেষ করে প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানির জন্য তালিকাভুক্তি সহজ করতে হবে।’

সিঙ্গাপুরে তালিকাভুক্তি কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক বলেও মনে করেন তিনি। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ অঞ্চলের বেশির ভাগ স্টার্টআপের প্রধান কার্যালয় সিঙ্গাপুরে, তাই এখানেই তাদের তালিকাভুক্ত হওয়া উচিত।’

আরও